বাংলাদেশে ধর্ম আজ এক অদ্ভুত সময় পার করছে। একসময় যে ধর্ম মানুষকে ন্যায়, জ্ঞান ও মানবিকতার পথে আহ্বান করেছিল, সেই ধর্ম এখন প্রায়ই অজ্ঞতা, ভয়, বিভাজন ও ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। “ধর্ম এখন মূর্খদের দখলে”—এই কথাটি হয়তো কারও কাছে কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় তাকালে দেখা যায়, ধর্মচর্চার নেতৃত্ব এখন এমন এক শ্রেণির হাতে চলে গেছে, যারা জ্ঞানের চেয়ে বেশি আগ্রহী জনপ্রিয়তা, রাজনীতি এবং অর্থের মোহে।
ধর্মের মূল লক্ষ্য ও আজকের বাস্তবতা
ইসলামসহ সব ধর্মের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষকে সত্য, ন্যায়, মমতা ও সহাবস্থানের পথে পরিচালিত করা। কিন্তু আজ ধর্মচর্চার রূপটা অনেকটাই বদলে গেছে। মসজিদের মাইকে, ইউটিউবের মঞ্চে, কিংবা টিকটকের লাইভে—ধর্ম এখন প্রতিযোগিতার বস্তু।
ধর্মীয় বক্তারা ধর্মের গভীরতা নয়, বরং দর্শকের সংখ্যাকে মূল্যায়ন করেন মুখরোচক বাক্যালাপের মাধ্যমে। কোরআনের তাফসির বা নবীর প্রজ্ঞার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নাটকীয়তা, গল্প, কিংবা অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার।
প্রকৃত আলেমদের কোণঠাসা হওয়া
বাংলাদেশে প্রকৃত আলেম বলতে যাঁরা জ্ঞানের আলোকে, যুক্তি ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে মানুষকে পথ দেখাতেন, তাঁদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারণ তাঁরা জনপ্রিয়তার বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না।
তাঁদের ভাষা পরিমিত, বিশ্লেষণাত্মক এবং ধর্মকে রাজনীতি বা ঘৃণার উপকরণ বানানোর বিপক্ষে—তাই তাঁরা মিডিয়া ও মঞ্চে উপেক্ষিত।
অন্যদিকে, অল্পশিক্ষিত “মৌলানা ইউটিউবার” বা “ওয়াজ তারকা”রা ধর্মকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যেন তা যুক্তিহীন আবেগের খেলা—যেখানে যুক্তি ত্যাগ করা মানেই ঈমানদার হওয়া।
ধর্মব্যবসা: পবিত্রতার বাজারীকরণ
আজ ধর্মের নামে দেশে চলছে এক ধরনের “আধ্যাত্মিক পুঁজিবাদ”। ওয়াজ মাহফিল, দোয়া মাহফিল, দরবার, হুজুরের আশীর্বাদ—সব কিছুই যেন বাজারমূল্যে বিক্রির পণ্য।
কেউ হুজুরের ‘তাবিজ’ দিয়ে ভাগ্য বদলের আশ্বাস দেন, কেউ আবার ধর্মের ব্যাখ্যা বিকৃত করে রাজনৈতিক আনুগত্য সৃষ্টি করেন। ধর্মীয় পোশাক, নাম, এমনকি কণ্ঠস্বর পর্যন্ত ব্যবসার অংশ হয়ে গেছে।
রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ধর্ম
বাংলাদেশে ধর্ম সবসময়ই রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় স্তরে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবী, অন্যদিকে ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় গোষ্ঠীর তোষণ—এই দ্বৈতনীতি প্রকৃত ধর্মপ্রচারকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এক শ্রেণির মোল্লা-মাওলানা হঠাৎ করেই “দেশপ্রেমিক” বা “আদর্শবান আলেম” হয়ে ওঠেন, অথচ তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা প্রায় শূন্য। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস হারিয়ে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন।
জঙ্গীবাদী সংগঠনরূপে পরিচিতি
পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম এখন প্রায়ই এক বিকৃত চিত্রে উপস্থাপিত হয়—যেখানে “শান্তির ধর্ম” হিসেবে নয়, বরং “জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের প্রতীক” হিসেবে দেখা হয়। আফগানিস্তান, সিরিয়া বা আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে ধর্মের নামে গঠিত উগ্র সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড ইসলামকে এমন এক সংকটে ফেলেছে, যেখানে ধর্মের প্রকৃত শান্তিবাণী চাপা পড়ে গেছে অস্ত্রের আওয়াজে। অথচ এই বিকৃত ব্যাখ্যা ইসলাম নয়—বরং জ্ঞানের আলো থেকে বিচ্যুত কিছু মানুষের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার মাত্র।
এই তৎপরতা এখন বাংলাদেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেখানে সেখানে যাকে তাকে ধরে একশ্রেণীর উগ্রপন্থী যুবক ধর্মীয় জ্ঞানদানের উছিলায় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অপমান করছে। একটা ভিডিওতে দেখলাম এক যুবক বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে এক দম্পতিকে ধরে প্রশ্ন করছে, ‘আপনাদেরকে মহিলা সাথে করে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছে কে?’। অথচ বায়তুল মোকাররম মসজিদে নারীদের নামাজ পড়ার আলাদা স্থান নির্ধারিত আছে। ভিডিওটি নিচে দেয়া হলো।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ধর্ম এখন সমাজে বিভাজনের উৎস হয়ে উঠছে।
যেখানে ইসলাম মানুষকে “উম্মাহ”—এক দেহের মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়, সেখানে আজ সামান্য মতভেদেই একে অপরকে ‘কাফের’, ‘বেদআতী’, ‘মুনাফিক’ বলে গালমন্দ করা হচ্ছে।
মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক কিংবা পীরদের অনুসারীরা নিজেদের মধ্যে এমন বিভক্ত হয়ে পড়েছেন যে, ধর্ম এখন ঐক্যের বদলে বিভাজনের প্রতীক হয়ে উঠছে।
পথের দিশা: ধর্মে ফিরে আসার আহ্বান
প্রকৃত ধর্মচর্চা মানে হলো জ্ঞান, যুক্তি, এবং মানবিকতা—যা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শিক্ষা ও কুরআনের মূল সুর।
কুরআনে বলা হয়েছে—
“বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না—তারা কি সমান?” (সূরা আজ-যুমার, ৩৯:৯)
এই আয়াতই প্রমাণ করে যে, ইসলাম জ্ঞানের ধর্ম, অন্ধ অনুকরণের নয়।
তাই সমাজে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—আলোচনাভিত্তিক, যুক্তিসম্মত ধর্মচর্চা; যেখানে আলেম মানে হবে “জ্ঞানী ও বিনয়ী শিক্ষক”, “জনতাকে উত্তেজিত করা বক্তা” নয়।
উপসংহার
বাংলাদেশে ধর্ম আজ যেভাবে মূর্খদের দখলে চলে গেছে, তা একদিনে ঘটেনি; এটি বহু বছরের ধর্মের রাজনীতি, ভণ্ডামি ও অজ্ঞতার ফল।
প্রকৃত আলেমরা যদি আবার আত্মসম্মান নিয়ে দাঁড়াতে পারেন, যদি তাঁরা তরুণ সমাজকে জ্ঞানের আলোয় পথ দেখাতে পারেন—তবে ধর্মকে আবার উদ্ধার করা সম্ভব।
ধর্মকে মঞ্চে নয়, মনের ভেতর ফিরিয়ে আনতে হবে—যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবতা একত্রে বসবাস করে।








Leave a Reply